ফিলিস্তিনি-অ্যামেরিকান কবি ফেডি জুদাহ ২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েল যখন নৃশংস যুদ্ধ শুরু করে ফিলিস্তিনের গাজায়, তখন রিমুভ কবিতাটা প্রকাশের জন্য তিনি দ্যা নিউ ইয়র্কারে পাঠান। এবং শিল্প-সাহিত্যের ম্যাগাজিন হিসাবে দুনিয়াজোড়া খ্যাত এই সাপ্তাহিকি তা প্রত্যাখ্যান করে। যদিও এর আগে একই ম্যাগাজিন ফেডি জুদাহর অনুবাদে বিখ্যাত ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতা প্রকাশ করে। কিন্তু জুদাহ প্রত্যাখ্যাত হন যুদ্ধ সময়ে তার ভেতর থেকে আসা কবিতার প্রকাশ নিয়ে। এরপর সেই কবিতাসহ ফেডির বেশ দীর্ঘ এই লেখাটা ছাপা হয় লস অ্যাঞ্জেলেস রিভিয়্যু অব বুকসে। এইখানে সংক্ষেপিত অনুবাদ সেই লেখার। অনুবাদ: শামীমা বিনতে রহমান
উৎপাটন/Remove
তোমরা যারা আমাকে আমার ঘর থেকে উপড়ে ফেলেছ
তোমরা অন্ধ তোমাদের অতীতের প্রতি
যেইটা তোমাদের কখনোই ছেড়ে যায় নাই,
তোমরা তো আর ছুঁচো না
গন্ধে আর আন্দাজে বুঝে যাবে
আমার ওপর যা ঘটালে।
এখন তোমরা দীর্ঘসূত্রিতা করছো, শক্তি হারাচ্ছ, যেন ওই অতীতটা
একটা জলবায়ু পরিবর্তন, কোন গণহত্যা নয়,
যাতে এই বর্তমান কখনো শেষ না হয়।
কিন্তু তোমার সঙ্গে তোমার নিজের নৈকট্যের চাইতেও আমি বেশি নিকটে তোমার
এবং এটাই, মাই এনিমি ফ্রেন্ড,
এটাই হচ্ছে দূরত্বের সংজ্ঞা।
ওহ ক্ষুব্দ হৈয়ো না,
এই ভিডিওটা দেখ, লিঙ্ক পাঠাচ্ছি তোমাকে
ওইটাতে দেখবা তোমরা আমাকে পুরাপুরি উচ্ছেদ করে আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ
রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলসিলা মিছিলের দিকে, যেখানে
আমার বর্তমানের সকল বিপর্যস্ততা এখনো
তোমার অতীতের বিপর্যয়ের সমান নয়:
এইটাই কি সেই দেয়াল
যার বিরুদ্ধে তুমি ভাগ্যের চাল চালসিলা?
আমি শব্দের মূলগত অর্থে বলছি
আমি ওজনের ভারসাম্য তোমার দিকে হেলে পড়াতে রাজি,
কিন্তু আমি এসবের মধ্যে নাই আসলে, আমার একটা হৃদয় আছে যেইটা পঁচে,
প্রতিরোধ করে, এবং আশা করে, আমার জিন আছে,
তোমাদের মতোই, যেইটা সাবস্ক্রাইব করে না
কোন ক্ষত পিরামিডের।
তোমরা যারা আমাকে আমার বাড়ি থেকে উৎখাত করেছ
তারা আমার বাবা-মাকে উৎখাত করেছ
এবং তাদের বাবা-মাকেও উৎখাত করেছ তাদের থেকে।
আমার জানালা থেকে বাইরের দৃশ্য দেখতে ক্যামন দেখায়?
আমার লবনের স্বাদ ক্যামন?
আমি কি আমার নিজেকে একটু দোষ দিবো
যাতে তোমার নিজেকে তুমি ক্ষমা করতে পারো
আমার শরীরে? ওহ তুমি কত ভালোবাসো আমার শরীর,
আমার শরীর, আমার বাড়ি।
২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলি অ্যাপাটাইড (Apartheid) বা জাতি-ধর্ম-জাতীয়তাবাদ কাঠামোর বৈষম্যমূলক নীতি এবং এর ঔপনিবেশিক যুদ্ধ যন্ত্রের বিরুদ্ধে ফিলিস্তনিদের আরেক দফা বিদ্রোহ চলাকালে, প্রতিটা দিন যেন বছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। ফিলিস্তিনিদের প্রাণশক্তি বহণ করছিল এক অতি চেনা, বারবার ফিরে আসা যৌথ ট্রমা, যেটা ১৯৪৮ সালে দখলদারিত্বমূলকভাবে ইসরায়েলের সৃষ্টির পর থেকে তারা বয়ে বেড়াচ্ছে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। এই সাম্প্রতিক বিদ্রোহে, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে টিকে থাকার তীব্রতা আবারও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে, এক অতি প্রখর সচেতনতা – অসহায়ত্ব, হতবুদ্ধির প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া দুনিয়ার প্রতি। বেঁচে থাকার আনন্দ ব্যাপকভাবে মিশে যাচ্ছে শোক, ভয়ঙ্করতা, এবং এই দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসার এক ধরণের নৈতিক উপলব্দির সঙ্গে – ন্যায় বিচার, সহাবস্থান এবং সহমর্মিতার সম্ভাবনার প্রতি।
আমার এই ৫০ বছরের জীবনে আমি এই তীব্র আঘাতগুলার মুখোমুখি হয়েছি অসংখ্যবার। এই আঘাতগুলা, ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিত অস্তিত্বের একটি রূপ, যার ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের আসন্ন বিনাশ অনুভব করি—দেখতে চাই আমাদের কোন অংশটুকু উদ্ধার করা যায়, স্মৃতিতে ধরে রাখা যায়, আত্মায় সংরক্ষণ করা যায়, যেন পরেরবার, আরেক দফা আঘাতের মুখোমুখিতে আমাদের সংখ্যা কমে না যায়। আমরা এক এসিড সমুদ্রের তীরে বসে আছি, যার ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমাদের অস্তিত্ব ক্ষয়ে-ক্ষয়ে যাচ্ছে। যে বাতাস আমরা নিশ্বাসে নিচ্ছি তা বিষাক্ত। এমনকি এর ভেজা বালিও আমাদের শরীরের মাংস ধীরে ধীরে ক্ষয়ে দিচ্ছে। তবুও আমরা ভালোবাসি, এবং ভালোবাসা হলো, সাধারণ শিষ্ঠাচার, এবং সাধারণ শিষ্ঠাচার হলো কঠোর পরিশ্রম। আমরা দুর্ভেদ্য অন্ধকার খোদাই করে আলো ফুটাই। আমরা, গাজার কবি হোসাম মারৌফের (Hosam Maarouf) ভাষায় বলা যায়, “বাড়তি হৃদয় উৎপাদন করি/ কেননা, যদি কখনো আমাদের নিজ-নিজ হৃদয় হারায় ফেলি”।
এই ফিলিস্তিনি বিদ্রোহের তিন দিনের মাথায় আমার মনে হলো যে, আমি এখনো আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলিনি। আমি এড়ায়ে যাচ্ছিলাম, কারণ এরকম ভয় হচ্ছিল যে তাঁরা হয়তো এমন এক যন্ত্রণার পুনরাভিজ্ঞতা পাচ্ছেন, যেটা আমি পুরাপুরি বুঝতে পারব না, যদিও আমার পুরো জীবনজুড়ে তাঁদের পাশে থেকে অসংখ্য ফিলিস্তিনি ভয়ঙ্কর ট্রাজেডির সাক্ষী হয়েছি এবং তাদের সেই কষ্টের ভাগীদার হয়েছি। আমি শরণার্থী শিবিরে বড় হইনি, যুদ্ধ বা দখলদারিত্বের অভিজ্ঞতাও আমার হয় নাই। আমার জগৎ তাদের মতো নির্মূল হয়নি। আমার পৃথিবী ক্রমাগত ধ্বংস আর বিকৃতির মধ্যে নিমজ্জিত নয়, যেরকম লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনির জীবন ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের (গাজা, পশ্চিম তীর, ইসরায়েল) ভেতরে ও বাইরে চলছে। আমার বাবা ১৯৩৪ সালে ইসদুদ/আশদোদে জন্মগ্রহণ করেন, যা তখন একটি গ্রাম ছিল। ১৯৪৮ সালে, যখন আমার মা তাঁর মায়ের গর্ভে ছিলেন, তখন তাঁর মা গাজার একটি শরণার্থী শিবিরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আমার বাবা-মায়ের শৈশব ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাঁরা দেখেছেন কীভাবে তাঁদের বাবা-মা ভেঙে পড়েছিলেন, কীভাবে তাঁদের দেশছাড়া করা হয়েছিল। অসংখ্য ফিলিস্তিনির শরীরে, শরীর থেকে শরীরে এই চক্র পুনরাবৃত্ত হয়—বারবার।
গত কয়েক বছর ধরে আমি খুব কমই প্রকাশনার জন্য আমার লেখা “জমা” দিয়েছি; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি সম্পাদকদের অনুরোধে সাড়া দিয়েছি। আমি ইংরেজি ভাষায় ফিলিস্তিনকে বহন করি। কিন্তু আমার হৃদয়ে ফিলিস্তিন আরবি। আর আরবিতে ফিলিস্তিন বুঝানোর কোন ব্যাখ্যা দরকার পড়ে না। বিপর্যয়, দুর্যোগ, এবং একের পর এক ষড়যন্ত্রের মধ্যেও আরবিতে ফিলিস্তিন আত্মবিশ্বাসী। এটা ইংরেজির বাইরের, যদিও আন্তর্জাতিকতাবাদি হিসাবে এর জন্ম এবং তাই থাকবে—এটা নিজেকে বিশ্বের কেন্দ্র মনে করে না, আবার সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্রকে তার ভবিষ্যৎ মুক্তির প্রধান উৎস হিসেবেও মেনে নেয় না। আরবি ভাষায় ফিলিস্তিন সেই স্থান যেখানে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা হয়। আরবিতে ফিলিস্তিন স্বপ্ন দেখে, দেড় হাজার বছরের সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে বেঁচে থাকে এবং এর সীমানা তারও দশ হাজার বছর পেছনে বিস্তৃত। আরবি ভাষায় ফিলিস্তিনের ইতিহাস শেষ হয় না।
দ্য নিউ ইয়র্কার (The New Yorker) যদি “Remove” কবিতাটা প্রকাশের জন্য অনুমোদন করত, তাইলে কি আমি এই প্রবন্ধ লিখতাম? প্রথমত, তাদের গ্রহণ করার সম্ভাবনা বরাবরই ক্ষীণ ছিল। যখন ফিলিস্তিন এবং ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব স্বরের প্রসঙ্গ আসে, দ্যা নিউ ইয়র্কার, একটা প্রধান আমেরিকান ম্যাগাজিন হিসেবে অন্যান্য প্রকাশনার মতোই নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করে। কিছু নির্দিষ্ট সত্য আছে, যেগুলা যখন একজন ফিলিস্তিনির দ্বারা অ্যামেরিকায় উচ্চারিত হয়, তখন তা যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞান বিতরণকারি মহলের জন্য গেলা কঠিন হয়ে পড়ে।
উপরের প্রশ্নটা এটাও ধরে নেয় যে, যে হাত খাওয়ায়, তার আনুগাত্য মান্য করো। সংখ্যালঘু হিসাবে বিবেচনায়, ফিলিস্তিনিদের টোকেন হিসেবে ব্যবহার করা নতুন কোনো আমেরিকান প্রবণতা না। বরং, টোকেনাইজেশনকে বিবেচনা করা হয় নিপীড়িতদের অন্তর্ভুক্তি-মূলক প্রক্রিয়ার একটা অগ্রগতি। প্রসঙ্গটা দ্যা নিউ ইয়র্কার বা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক বড়। এটা ইংরেজি ভাষায় ফিলিস্তিনকে সীমিত ও নি:শেষ করার দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দেয় – “একটা কাঠামোগত নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ ব্যবস্থার (disciplinary communications apparatus) দিকে, যেটা পশ্চিমে বিদ্যমান মূলত ইসরায়েলের নেতিবাচক দিকগুলো এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এবং যারা সত্য বলতে চায় তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য” (Edward Said)।
বেশিরভাগ সময়ই, সম্ভাব্য সেরা পরিস্থিতিতেও, ফিলিস্তিনি প্রশ্নের স্পষ্ট সত্য উচ্চারণ করার দায়িত্ব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিদের ওপর থাকে না—বরং সেটি আসে অ-ফিলিস্তিনি, এমনকি নন-আরব বা মুসলিম অ্যামেরিকানদের মুখ থেকে, যদিও ফিলিস্তিনিরা সেইসব সত্য শিশু বয়স থেকেই জানে।
২০২১ সালের মে মাসে, একজন ইংরেজিভাষী ফিলিস্তিনি হিসাবে আমি দেখি এক নতুন হরর সিক্যুয়াল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে। আমার নিজেকে আবিস্কার করি একের পর এক কবিতা লেখার মধ্যে— মুহূর্তের ভেতরে লিখছিলাম, কিন্তু শুধুমাত্র সেই মুহূর্তের জন্য নয়। আমি অনেক আগে থেকেই এই দমনমূলক ভার সম্পর্কে সচেতন ছিলাম, ইংরেজি ভাষায় যা ফিলিস্তিনিদের চাপিষ্ঠ করে একটা সীমিত বৈশিষ্ট্যের পণ্য বানায়—এক বিকৃত বিদ্রুপ—যা সেই সহিংসতার চারপাশে আবর্তিত হয়, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সংস্কৃতি ও ব্যবস্থা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করতে ব্যবহার করে।এই ভয়ংকর সীমাবদ্ধতা যেন শারীরিকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিচিত্র। মেইনস্ট্রিম ইংরেজি ভাষার মিডিয়ায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি যে রেশমি সহানুভূতি দেখা যায়, সেটা নিপীড়িতদের ভাষাকে চমৎকার মনে করে মূলত তখনই, যখন সেই ভাষা আমাদের গণহত্যা থেকে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায় বা চেকপয়েন্টের অবমাননা সহ্য করার পাঠ দেয়।
তবুও এটা অস্বীকার করার জো নাই যে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ফিলিস্তিনিদের অবস্থা এক যুদ্ধকালীন কারাগারের মতো। তাদের লেখালেখি সেই কারাগারের ভেতরেই করা ছাড়া উপায় নাই। যে জানালাগুলো দিয়ে ফিলিস্তিনিরা বাইরের পৃথিবীকে দেখে, সেগুলো শুধু ছোটই নয়, আটকানোও। আর ফিলিস্তিনিদের দৃষ্টির নজরে আসে বাইরের বিশালতা — এর বুনোফুল ও রসুন, এর ইনস্টাগ্রাম ও আইসক্রিম —অবরুদ্ধ জানালার ওপরে জমে থাকা তাজা ও শুকিয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের রক্ত।
ইংরেজি ভাষায় পৌঁছাতে, ফিলিস্তিন এক বিকৃত দৃষ্টিপ্রিজমের ভেতর দিয়ে যায় এবং প্রায়ই সেটাকে নৃতাত্ত্বিক বিবরণ হিসেবে ধরা হয়। কিছু পাঠকের জন্য, এই অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গি (positionality) সংহতি জাগায়। আবার অন্যদের জন্য, এটা ফিলিস্তিনিদের বন্দী করে এক করুণার কাঠামোর মধ্যে, যেখানে তারা কেবল ধ্বংসস্তূপে পরিণত এক জাতি। আমরা দেখছি, যেভাবে আমরা বহু দশক ধরে দেখে আসছি — গাজা, এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েল একদিকে ফিলিস্তিনি জীবন ও সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ণ করে ফেলছে, অন্যদিকে যারা টিকে আছে তাদের জন্য শ্বাসরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে।
ইংরেজিতে ফিলিস্তিন সেই নিয়ন্ত্রিত সম্পাদকীয় গেইটগুলার ভিতর দিয়ে পথ খোঁজে, যেটা ইংরেজি ভাষা ফিলিস্তিনের ওপর আর ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে নিজেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ চাপায়। এই গেইটকিপিং শুধু কবিতা, স্মৃতিকথা বা উপন্যাসের ক্ষেত্রেই না, এটা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে মতামত-সম্পাদকীয়গুলার ওপরও প্রভাব ফেলে।
একাডেমিয়ায় হয়রানিমূলক নজরদারি মহামারীর মতো। সূক্ষ্ম ইঙ্গিত থেকে প্রকাশ্য বিদ্বেষ পর্যন্ত বিস্তৃত ফিলিস্তিনবিরোধী ও আরববিরোধী মনোভাব পোষণ করা সেখানে ক্যারিয়ার এগিয়ে নেয়ার একটা উপায়। এবং যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতন্ত্রে প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের দমন-নিপীড়ন করা আক্রমনাত্মক দেখায়, তাই গোপন প্রচারণা বিবেচিত হয় পরবর্তী সেরা বিকল্প হিসাবে — ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা প্রায়শই সম্মানজনক পথ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই অদৃশ্য করে ফেলা বা উপেক্ষা করার মনোভাব প্রায়ই ইংরেজিভাষী আরব ও মুসলিমরা নিজেদের ভেতরে গ্রহণ করে নেয়, এবং ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনকে দৃশ্যমান ও প্রকাশযোগ্য করে তোলার চেষ্টা ছেড়ে দেয়। কিন্তু যদি কেউ একটু প্রকাশ্যে আসতে চায়, তবে তাকে মানায়ে নিতে হয় এমনসব স্বাভাবিক করে ফেলা শর্তের সঙ্গে, যেগুলা শ্রেণি কাঠামো, সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্যযাচাইয়ের কঠোরতার সাথে সমন্বিত,—ফিলিস্তিন নিয়ে লেখেন এমন সব লেখকের ক্ষেত্রে এটা সমানভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
এত দরজা খোলার মতো যে, যখনই একটি দরজা খোলে বা পরিত্যক্ত হয়, যেটায় ফিলিস্তিনিরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে, তখন তা এক বিশাল মানবতাবাদী বিজয় বা বৈপ্লবিক সাফল্যের মতো মনে করা হয়। কিছু ইহুদি আমেরিকান—কেউ মৃদু জায়নিস্ট, কেউ প্রকাশ্যে অজায়নিস্ট, তারা তাদের সুবিধাজনক অবস্থান মেনে নিতে সংগ্রাম করেন। ফিলিস্তিনিদের ইংরেজিতে বর্ণনা করা ও মিডিয়ায় তাদের উপস্থিতির ওপর যে ক্ষমতার সম্পর্ক তারা ধরে রাখেন, তা বিস্ময়কর। একজন ইহুদি আমেরিকান লেখক বা সম্পাদক, যিনি শুরুতে ফিলিস্তিনপন্থী অনুভূতি নিয়ে কাজ শুরু করেন, পরে তিনি এমন এক শক্তিশালী ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারেন, যার মাধ্যমে ইংরেজিতে ফিলিস্তিনি ন্যারেটিভের ওপর তিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
এই কথোপকথন, পুরো আলোচনাটা আসলে মূলত আমেরিকান ইহুদিদের ও জায়নিজমের বিষয়ে, একটি অভ্যন্তরীণ বিতর্ক হিসেবে—যেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব, যদি তা থাকেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন অ-ফিলিস্তিনি প্রতিনিধির মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়।
আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান কোনো জৈবিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি যে, যন্ত্রণা বা কষ্টের কোনো শ্রেণিবিন্যাস আছে। আর কারো এ আবিষ্কারের জন্য অপেক্ষা করাও উচিত নয়। মাইক্রো এবং ম্যাক্র, উভয় লেবেলেই আমরা জানি, শরীরে ট্রমা বাস্তব। সামষ্টিক ট্রমাও কম বাস্তব নয়। তবে, ন্যায়বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া কখনো আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। যদি আমাদের এই সময় নৈতিকতার গণিত মেনে চলে, বা দূর্গতির শিকারদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ন্যায্যতার নীতিতে চলে, তবে আসুন ফিলিস্তিনের হিসাব কষি, যে দোষি তাকে দোষি হিসাবেই দেখি। এবং মনে রাখি, মাহমুদ দারবিশ (Mahmoud Darwish) আমাদের সম্মরণ করায় দেন: “একটা ঘরকে হত্যা করা মানে গণহত্যাও […]/ প্রতিটি জিনিষের ভেতরেই এক অস্তিত্ব আছে, যে ব্যথা পায়।”
মাহমুদ দারবিশের মৃত্যুপরবর্তী স্মৃতিচারণে প্রয়াত উরি আভনেরি (Uri Avnery) তাদের প্রথম সাক্ষাতের কথা বলেন, যা সম্ভবত ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে হয়েছিল। সেই বৈঠকে ফিলিস্তিনি কবি রাশিদ হুসাইনও ( Rashid Hussain) উপস্থিত ছিলেন। আভনেরির লেখায় স্পষ্ট নয়, কোন কবি এই কথা বলেছিলেন, তবে তিনি স্পষ্টভাবে মনে রেখেছিলেন একটি প্রশ্ন, যা ছিল এক ধরনের বিবৃতি:“জার্মানরা ছয় মিলিয়ন ইহুদিকে হত্যা করেছিল, এবং মাত্র ছয় বছর পরই তোমরা তাদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেছ। কিন্তু আমাদের সঙ্গে, ইহুদিরা শান্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়।”
এরমধ্যে গভীর এক মানবতাবাদ নিহিত রয়েছে। এটা রাজনৈতিক ইতিহাসের ফলে গড়ে ওঠা আত্মপরিচয় গঠনের গভীরে পৌঁছে যায়। যেমন ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আবার, অনেক ইহুদি-আমেরিকান এখনো এই সরল, কিন্তু তীক্ষ্ণ বাস্তবতাকে মেনে নিতে চান না, যে, তাদের পরিচয়ের গঠন ফিলিস্তিনি পরিচয়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে—এবং অনেকের কাছে এটা অকল্পনীয় কিংবা ঘৃণ্যও মনে হয়।
২০২১ সালের মে মাসে লেখা আমার কবিতাগুলো প্রকাশ করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু যখন সেগুলো জন্ম নিল, আমি যেন এক বধির সমুদ্রের সামনে দাঁড়ায়ে গেলাম—“প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার ভীতির গভীর প্রভাব” যেমন একাধিক খ্যাতনামা কবি আমাকে বলেছিলেন আমেরিকান সংস্কৃতির অনুমোদনহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনি কণ্ঠস্বরের প্রতি একঘেয়ে অথচ নির্মম দমননীতির কথা।
কয়েকজন সম্পাদককে আমি একটা করে কবিতা পাঠালাম, আর কিছু সংখ্যক সম্পাদককে একসঙ্গে কয়েকটি কবিতা পাঠালাম। আমি “জমা দেওয়ার” প্রচলিত প্রক্রিয়ায় আগ্রহী ছিলাম না। তাছাড়া, ২০০৮ সালে, দ্যা নিউ ইয়র্কার এবং দ্যা নিউ ইয়র্ক রিভিয়্যু অব বুকস ( The New York Review of Books) মাহমুদ দারবিশের মৃত্যুতে দ্রুততার সঙ্গে আমার করা তার কবিতার অনুবাদ প্রকাশ করেছিল।
এবার আমি প্রধান প্রকাশনাগুলোর কাছে অনুরোধ করছিলাম আরও ফিলিস্তিনি কবিতা দ্রুত প্রকাশ করতে, কারণ আমরা আবারও আরেকটি ফিলিস্তিনি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন একটা বাস্তবতা, যা অতীতে তাদের কাছে দয়া ও সহানুভূতির যোগ্য মনে হয়েছিল। দ্য নিউ ইয়র্কারে, আমি শীর্ষ পর্যায়ের মাধ্যমে কবিতাটি যথাযথ ব্যক্তির হাতে পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। এরপর এল প্রত্যাখ্যান।
পূর্বনির্ধারিত দৃষ্টিকোণ থেকে Remove কবিতার পাঠ অনেক পাঠকের অভিজ্ঞতাকে সীমিত করে দেয়। Remove নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করে না, কারণ নামে কখনো কখনো পূর্ব নির্ধারিত প্রতিক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে জুড়ে থাকে, যা বিশ্বের সাথে বিস্তৃতভাবে সংযুক্ত হবার সুযোগ কমিয়ে দেয়।একজন ফিলিস্তিনিকে ইহুদিদের প্রতি ভালোবাসার যোগ্যতা প্রমাণ করতে বাধ্য করা যেমন অন্যায়, তেমনি উল্টা দিকেও তা সমান অন্যায়। ফিলিস্তিনিদের যদি সদিচ্ছার পরিচয়পত্র দেখাতে হয়, সেটাও অন্যায়।এই চালাকিপূর্ণ আগ্রাসন আরও ভয়াবহ, কারণ অসংখ্য আমেরিকানকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি এ ধরনের কিছুই প্রমাণ করতে হয় না। পশ্চিমা বিশ্বে আমাদের অনেকের পক্ষেই কল্পনা করা কঠিন, ২০২১ সালে দাঁড়ায়ে কেমন সেই যন্ত্রণা, যা লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি প্রতিদিন অনুভব করেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে আসছেন? তবুও, প্রতিটি মানুষের হৃদয় সমবেদনা গ্রহণের মাত্র এক ধাপ দূরে থাকে—সব সময়
আবারও বলছি, আমার বক্তব্য দ্যা নিউ ইয়র্কারকে ঘিরে নয়। উদাহরণস্বরূপ, আমি সন্দেহ করি যে দি আটলান্টিক (The Atlantic) ভিন্নভাবে আচরণ করত কি না। আর কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times)-এর সাম্প্রতিক সামান্য উদারতায়—যেখানে ফিলিস্তিনি কণ্ঠস্বরকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, তারা এখনো জায়নিস্ট তরঙ্গের মাঝে ডুবে আছে।(এই চিত্রকল্পটি ফিলিস্তিনি-ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ফারাহ নাবুলসি/Farah Nabulsi তার ছোট কিন্তু গভীর কবিতারূপী চলচ্চিত্র Oceans of Injustice-এ অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন।)
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল দ্যা গার্ডিয়ানের (The Guardian) সঙ্গেও। আমি আমার কবিতা If Stones Were Slingshots পাঠায়ছিলাম, কিন্তু দ্রুতই তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এই কবিতাটি ছিল If Rockets Didn’t Fly-এর সঙ্গে আমার চলমান সংলাপ। একজন ইয়েমেনি বা সিরীয় বেসামরিক নাগরিক, যিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধে আছেন, কেবল টিকে থাকার লড়াইয়েই থাকতে হচ্ছে তাকে, তিনি হয়তো Slingshots-এর বেদনার্ত রূপকথায়, নেতিবাচক মিস্টিসিজমে, কিংবা একটি লেখকবিহীন ভিজ্যুয়াল নথির একফ্রাসিসে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন —“যেখানে আল্লাহকে খুঁজে নিতে হয় আল্লাহরই পরিত্যাক্ত এক জগতে” (György Lukács)।
টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট জানিয়ে দিল যে তারা আমার কবিতাগুলো দেখতে দুই মাস সময় নেবে। অন্য কোন সম্পাদক কোনো উত্তরই দিলেন না। তবে কয়েকজন ছিলেন একটু বেশি সহানুভূতিশীল। সবই হারিয়ে যায়নি।
তবুও, বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখকদের কাছে লেখা চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নাই সম্পাদকরা, অথবা স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগই দেওয়া হয়নি। এমনকি কোনো সম্পাদকই ২০২১ সালের মে মাসের সেই দুঃসহ দিনগুলোর মধ্যে তাদের প্রিয়জনদের কথা জিজ্ঞেস করেননি।এর বদলে, ফিলিস্তিনিরা দেখল ট্রেভর নোয়া (Trevor Noah) কীভাবে তার স্বচ্ছতা হারিয়ে ফেললেন, জন অলিভার (John Oliver ) বললেন “যুদ্ধাপরাধ”, আর সবাই সতর্কতা হিসেবে অগণিত ডিসক্লেইমার ছুঁড়ে দিলেন—ঠিক যেন দর্শকদের বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে যে আমাদের সেরা মুহূর্তেও আমরা আমাদের অত্যাচারীদের মৃত্যু বা কষ্ট চাই না। তারপর রাউল পেকের (Raoul Peck) টিভি-ডক্যু সিরিজ Exterminate All the Brutes য়ে ফিলিস্তিনের কথা এক্কেবারে উপেক্ষা করল, শুধু এটুকু বলল, “বিষয়টা জটিল।”
ফিলিস্তিন প্রশ্ন যেকোনো প্রগতিশীল আলাপের জন্য অপরিহার্য, বিশেষ করে আমেরিকানদের (এবং পশ্চিমা) আত্মমূল্যায়ন প্রসঙ্গে। ফিলিস্তিন আমাদের সৎ থাকতে বাধ্য করে এবং আমাদের উদ্বৃত্ত দমন (surplus repression) থেকে মুক্তির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ চাকার মতো কাজ করে। নেলসন ম্যান্ডেলা যখন বলেছিলেন, “দক্ষিণ আফ্রিকা তখনই মুক্ত হবে, যখন ফিলিস্তিন মুক্ত হবে” (অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ চিন্তাবিদ ও কর্মীদের অনুরণিত করে), তখন তিনি ফিলিস্তিনকে কেবল এক রূপকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি।
এবং এখানেই আমি আরেকটি স্মৃতি মনে করি। কয়েক বছর আগে একটি সাহিত্য উৎসবে আমি মঞ্চ শেয়ার করেছিলাম এক শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান লেখকের সঙ্গে, যিনি সেখানকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। একান্তে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এত বছর পর কালো দক্ষিণ আফ্রিকান সাহিত্য কোথায়?” তার উত্তর ছিল: “তুমি আমার উত্তর পছন্দ করবে না। কিন্তু সত্য হলো, তাদের লেখাগুলো তেমন ভালো নয়।” হতে পারে, আমি নিজেও তা-ই ভাবতাম যদি সেগুলো পড়তাম। তবে আমি অন্তত এই সম্ভাবনাটি বিবেচনা করতাম যে, অন্যের ভাষা আমাকে আমার “আমি” থেকে মুক্ত করতে পারে অসাধারণ ও অপরিহার্য উপায়ে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসি কবি লায়োনেল ফোগার্টির (Lionel Fogarty,) কাজের মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য এক দুর্দান্ত উপহার ছিল।
অন্যের রাজনৈতিক মানবতাকে সমান হিসেবে গ্রহণ করা তার কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকেও সমানভাবে গ্রহণ করার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। অথবা কাফকা ও দরবিশকে একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত করে বলা যায়: এমন কোনো জাতি নেই, যারা তাদের কবিতার চেয়ে ছোট।
লন্ডন রিভিয়্যু অব বুকস (London Review of Books), দ্যা নিউ রিপাবলিক (The New Republic), দ্যা নেশন (The Nation), এবং আরও অনেক প্রভাবশালী প্রকাশনা, শিল্প ও সাহিত্য সাময়িকীগুলা, যদি বা যখন ফিলিস্তিনি বা ফিলিস্তিনপন্থী লেখা প্রকাশ করে, তা করে একধরনের তত্ত্বাবধানের আবরণে এবং কৌশলগত আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার মানসিকতায়।
তাহলে, ‘Remove’ কবিতাটা ‘শান্তির সময়ে’ কীভাবে পড়া যেতে পারে? অথবা যদি এর লেখক ফিলিস্তিনি না হতেন, কিংবা নিজেকে ফিলিস্তিনি বলে ঘোষণা না করতেন? কারণ এটা এমন একটা কবিতা, যা পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি বা জাতিকে রেহাই দেয় না—যাযাবর জীবনের দিনগুলো থেকে শুরু করে, প্লেবিয়ানদের সময়, এবং দখলদারিত্ব, উচ্ছেদ, নির্মম শুদ্ধি অভিযান, আধুনিক শহরগুলোর হৃদয়হীন জেন্ট্রিফিকেশন, মহামারির সময় দরিদ্রদের উচ্ছেদ, অর্থনৈতিক পতন, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির দখল, অথবা লাগামহীন লোভের মধ্য দিয়ে। এখানে “আমি” বা “তুমি” বলে কিছু নেই, যেমনভাবে প্রতিটি দেহের একক আত্মা বলেও কিছু নেই।
নিউরোসায়েন্স আজ নিশ্চিত করেছে যা শতাব্দী বা সহস্রাব্দ আগে মরমীবাদীরা জানতেন: আত্মা বহুস্তরবিশিষ্ট, আর তার সবচেয়ে বিস্ময়কর আকাঙ্ক্ষা হলো একাত্মতার সন্ধান, যদিও সে জানে যে এই একাত্মতা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু একবার এটা অনুভব করতে পারা হয়তো এতটাই গভীর, যে অনেকের পক্ষে আর তার সত্যকে ভুলে থাকা সম্ভব হয় না। অথবা এটি মায়া আবু-আলহায়য়াত (Maya Abu-Alhayya) যেভাবে বলেন “You Can’t” কবিতায়:
অবশেষে তারা পড়ে যাবে,
যারা বলে, তুমি পারবে না।
বয়স বা বিরক্তি তাদের গ্রাস করবে,
অথবা কল্পনার অভাব।
আগে হোক বা পরে, সব পাতা মাটিতে পড়ে।
তুমি হতে পারো শেষ পাতা।
তুমি মহাবিশ্বকে বোঝাতে পারো
যে তুমি গাছের জীবনের জন্য
কোনো হুমকি নও।

ফেডি জুদাহ
ফেডি জুদাহ’র মা-বাবা ফিলিস্তিনি কিন্তু তিনি জন্মান অ্যামেরিকায়, লিখেন ইংরেজি ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় লিখেন বলেই তিনি খুব পরিস্কার বুঝতে পারেন এই ভাষা এবং এই ভাষা ব্যবহারকারি অ্যামেরিকান মিডিয়ার ফিলিস্তিনকে নিয়ে পলিটিক্স।ইংরেজি ভাষায় তার কবিতা এবং আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ কবিতায় তাই মূলত: আসে ফিলিস্তিনিদের শরনার্থী অভিজ্ঞতা আর আইডেন্টিটি প্রশ্ন।
তিনি কবি এবং অনুবাদক। ২০২৪ সালে তার ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়, যার শিরোনামে কোন শব্দ, বাক্য নাই, শুধু ব্রাকেটবন্ধী তিনটা ডটস। শিরোনামটা এমন: […]। এই সংকলনে বেশ কিছু কবিতা আছে যা অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৩-এর মধ্যে লেখা হয়েছিল, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের শুরুর দিককার সময়ের।এই বই ২০২৪ সালের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর পোয়েট্রির চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়।
২০০৭ সালে তিনি আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতার সংকলন দ্য বাটারফ্লাই’স বারডেন (The Butterfly’s Burden)। ওই বছরই যুক্তরাজ্যের বানিপাল পুরস্কার (Banipal prize) পায় বইটা। ২০০৯ এবং ২০১৩ সালে তিনি মাহমুদ দারবিশের কবিতার আরো দুটি অনুবাদ বই করেন: ইফ আই ওয়্যার অ্যানাদার/ (If I were another/ ২০০৯) এবং দ্যা সাইলেন্স দ্যাট রিমেইনস (The Silence That Remains)। ইফ আই ওয়্যার অ্যানাদার অনুবাদের জন্য তিনি পেন ইউএসএ (PEN USA) পুরস্কার পান ২০১০ সালে। ২০১২ সালে তিনি অনুবাদ করেন আরেক ফিলিস্তিনি কবি ঘাসান জাক্তানের কবিতার সংকলন লাইক অ্যা স্ট্র বার্ড ইট ফলোস মি অ্যান্ড আদার পয়েমস (Like a Straw Bird It Follows Me, and Other Poems)। এই অনুবাদ সাহিত্যের জন্য তিনি গ্রিফিন পয়েট্রি প্রাইজ পান ২০১৩ সালে।
অনুবাদ সাহিত্যের বাইরে তার লেখা প্রথম প্রকাশিত বই, দ্য আর্থ ইন দ্য অ্যাটিক (The Earth in the Attic)। যুদ্ধ আর অস্তিত্বের সঙ্কট ঘেরা এই কবিতার বইটি ২০০৭ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রকাশনির সেরা তরুণ লেখক পুরস্কার পায়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কবিতার বই অ্যালাইট (Alight)। ২০২১ সালে প্রকাশিত হয় কবিতার বই টেথারড টু স্টারস (Tethered to Stars)।
তিনি অ্যামেরিকার টেক্সাসের হিউস্টনে একটি মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপনা করেন।
লস অ্যান্জেলেস রিভিয়্যু অব বুকসে প্রকাশিত ফেডি জুদাহ’র লেখার লিংক:
https://lareviewofbooks.org/article/my-palestinian-poem-that-the-new-yorker-wouldnt-publish