শামীমা বিনতে রহমান
“মা ইনকাম আবার কী?”
রান্নাঘরে পৌষ-সংক্রান্তির পিঠা বানানোর জন্য আখের গুড় হাত দিয়ে ডলে ডলে কোরানো নারকেলের সাথে মিশাচ্ছিলো দিপালী রানী। মনের মধ্যে এম্নিতেই এক অশান্তি মাছির মতো ভনভন করছে। মন কই-কই হারায় যাচ্ছে, বার বার। কপালে, দুই ভ্রুর মাঝখানে দুইটা বড় আর একটা ছোট ভাঁজ। ভাঁজ গুটায়া মুচকি একটা হাসি দিয়ে মা বললো, “ইনকাম কী, এন কী করে বুঝামু? বড় মাইনসে করে।”
“ঠাকুরেরা করে?”
“তা তো জানি ন্যা।”
এক হাত গামলায় ডলাডলি আরেক হাত মাটির চুলায় কড়াইতে ফুলতে থাকা দুধে কাঠের চামচ দিয়ে নাড়ানাড়ি করে বাস্প উড়ায় দিতে দিতে দিপালীর মনে ধাক্কা মেরে প্রশ্নটা আসলো, সাত বছরের মেয়ে এই ইংরেজি শব্দ শুনলো কোথায়? ঘরে তো তারা আয়-রোজগার বলে, ইনকাম তো বলে না। স্কুলে কি শুনছে? গত বছর থেকে মেয়ে স্কুলে যায়। দীপালি গলা ছেড়ে ডাকলো তার শ্বাশুড়িকে, “ও মা, তুমি কি ইনকাম কতডা হুনচ?”
“হ, ক্যারে?”
“এই যে জবায় জিগায়। অরে তুমি বুজাও।”
জবার মুখে হাসি। তার কথায় মা আর ঠাকুরদি ব্যস্ত হয়ে গেছে, ওর মুখের হাাসিতে আনন্দের শব্দও শোনা যায়। ঘরের ভেতর থেকে বের হয়ে রান্না ঘরের কাছে আসতে আসতে ঠাকুরদি দুই হাত নাড়াতে নাড়াতে বললেন, “ইনকাম হৈলো ট্যাকা-পয়সা হাতে আসা, আয় রোজগার করা। এই যে তুমার আব্বায় যে হাটে গিয়া ধান বেঁচলো, ট্যাহা পাইলো। এইটা ইনকাম। মাইনষে চাকরি কৈরা ইনকাম করে, ব্যবসা কৈরা ইনকাম করে, কিরষিকাজ কৈরা ইনকাম করে।” দিপালী বললো, “মা, ঠাকুরেরা কি ইনকাম করে? জবা রানী আমারে জিগায়।” বলে সে ঠোঁট টিপে হাসলো।
“ঠাকুররা তো ঠাকুরই। ওরা কি মানুষ? মাইনষের ইনকাম লাগে, ঠাকুরের লাগে না।”
একটা পিঁড়ি টেনে গীতা সাহা বসলেন জবার পাশে। অনেক ক্লান্ত তিনি। সেই ভোর চারটায় চান করে একটানা কাজ করেই যাচ্ছেন: কলা গাছের কচি ডগা কেটে, ডগার গোল মাথাটা ঢেঁকিতে কুটা আতপ চালের গুঁড়িতে চুব-চুব ডুবায়ে প্রথমে ঘরের ভেতরের এক কোনায় পুজা করার জায়গায় ঠাকুর পূজা করেন, পরে পুরা বাড়িতে যতগুলা দরজা, প্রবেশ পথ আছে সবখানে কলার ডগার গোলে জড়ানো চালের গুড়ার গোল গোল ছাপ বসান। কোথাও কোথাও পাঁচটা গোল্লা, দুইপাশে দুইটা করে চারটা, আর মাঝখানে একটা। কোথাও কোথাও বসান ছয়টা গোল্লা। বিভিন্ন জায়গায় সাদা সাদা গোলের ছাপ লাগানো শেষে পুরা উঠান ঝাড়ু দেন, রান্না ঘর লেপা বাকি ছিলো, সেটা লেপেন। জবা গীতা সাহার হাঁটুর সাথে গাল ঠেসে বাম হাত দিয়ে চুলে আঙ্গুল নাড়াতে নাড়াতে মায়ের দিকে তাকায়।
দিপালী বুঝলো জবার মন থেকে প্রশ্নটা নিমিষ হয় নাই। ঠাকুর নিয়ে সন্দেহজনক ভাবনা না ভাবাই মঙ্গল ভেবে সে আর কথা বাড়ায় না।
বাহির থেকে এ বাড়িতে ঢোকার প্রবেশ পথে কোন দরজা নাই, কিন্তু দুইপাশে ঝোপ ঝোপ ফুল গাছের সারি একটা খোলা দরজার মতো হয়ে আছে। কয়েকটা লাল জবা দুই পাশেই আছে; শিউলি, গুলঞ্চ, টগর, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা ছাড়ও, হলুদ, খয়েরি গাঁদা, বেলি, নয়নতারা, আরো কয়েক ধরণের ফুলের সাথে বড় দুইটা লেবু গাছও আছে। ওই দিক দিয়ে ঢুকলে বাম দিকে গরুর ঘর। তারপাশে খড়ের গাঁদা, তারো পিছনে একটা মাঝারি আকারের মাটির ঘর। ওইটাতে ধানের গোলা আর লাকড়ি রাখা। এর একটু সামনে টিনের চালা আর টিনের বেড়ার থাকার ঘর। এই ঘরের একটু দূরেই রান্না ঘর। উপরে টিন আর মাটির দেয়াল। ছাদ আর মাটির দেয়ালের মাঝখানে বেশ ফাঁকা, যাতে ধোঁয়া উড়ে যেতে পারে। দরজা বলতে কিছু নাই। দুই চুলায় দিপালীর দুই হাতই খুব ব্যস্ত। একটা চুলায় গরমপানির পাতিলে মাটির ঝাঁঝরায় সূতি কাপড়ের ভেতরে থাকা পুলি পিঠা ভাঁপে সেদ্ধ হচ্ছে। আরেক চুলায় গরম তেলের কড়াইয়ে থকথকে সেমি-তরল আটা গোল চামচ দিয়ে ঢেলে তেলের পিঠা ভাজছে। এরমধ্যে আবার চুলায় লাকড়ি শুকনা পাতা দিয়ে আগুনের তাপও নিয়ন্ত্রণ করছে। দিপালীর কপালে এখনো ভাঁজ, মুখে কথা সামান্যই।
সকাল আটটার মতো বাজে। উঠানের চারদিকে আম, কাঁঠাল, নারকেল, বেল, বড় বড় গাছের পাতলা হয়ে যাওয়া পাতা-ডাল দিয়ে রোদ এসে শুয়ে পড়েছে। ভোরের ঘন কুয়াশা এখন হাল্কা হয়ে আসছে, তা-ও মনে হয় রোদের গায়ে পাতলা পলিথিন লাগানো আছে। সকালের দিকে শীতটা একটু মারাত্মকই লাগে এই জানুয়ারির মাঝ দিকে।
মলয় সাহা টমি হিলফিগারের ফেইক লোগো মারা একটা সাদা টিশার্টের উপরে চেইন খোলা নীল রঙের জ্যাকেট পরে দিপালীর পাশ থেকে অল্প একটু দূরে একটা নীল রঙা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে মোবাইল টিপাটিপি করছে। কিন্তু তার অর্ধেক মন দিপালীর দিকে, যদি কিছু লাগে য্যানো সঙ্গে সঙ্গেই দিতে পারে। সংক্রান্তির দিনে পূজা করা আর পিঠা-পুলি বানানো প্রতি বছরের একটা নিয়মের কাজ। পারিবারিক, ধর্মীয় ঐতিহ্য ধরে রাখার এই কাজে ঝাক্কি কম না। বিয়ের দশ বছর হয়ে গেলেও দিপালী একদমই পুজা-আচারের চাপ নিতে চায় না, বিশেষ করে যেসব পুজা মাঝরাতে বা ভোর রাতে করতে হয়, সেগুলাতে তার চরম অনীহা। রান্নার কাজও মাঝে মাঝেই দিপালী নিতে চায় না। তাই মলয়ের হাতে সময় থাকলে, রান্নার সময় সে দিপালীর আশে পাশেই থাকে।
পিঠা বানানো শেষ। উঠানে রোদে একটা পাটি বিছায়ে তারা বসে গেলো পিঠা খেতে। গালের ভেতর কয়েকটা পিঠা টপাটপ ঢুকায়ে দিপালী চলে গেলো গোয়াল ঘরের দিকে। গরুদের পিঠা খাওয়াতে। তিনটা গরুর একটা পরিবার এখন আছে তাদের। পুজা পার্বণে যাই-ই তারা খায়, গরুদেরও তাই-ই খেতে দেয় দিপালী। গরুগুলার নামও তার দেয়া। পুরুষ গরুটাকে ডাকে বুদ্ধু, নারী গরুকে লালী আর বাচ্চা গরুটার নাম দিয়েছে লীলা। গরুগুলার সামনে তিনটা বিশাল বিশাল গামলার মতো খাবারের পাত্র। তাতে স্যুপের মতো ঘোলা পানিসহ ঘাস দেয়া। দিপালী লালীর মুখে পিঠা ধরতেই সে মুখ ঘুরায় নিলো, লীলাও খেলো না, কিন্তু বুদ্ধু তার হাত থেকে গপগপ করে পুলি পিঠা খেয়ে নিলো। দিপালীর মনটা খুশীতে ভরে গেলো যে বুদ্ধু তার পিঠা পছন্দ করেছে। সে গোয়াল ঘরের এক পাশে একটু আড়ালমতো জায়গায় বসে পড়লো।
এই বাড়িতে তার কোন ফুলতলা না, এই গন্ধঅলা গোয়ালঘরটাই বেশি ভাল্লাগে। এখানে সে বুদ্ধু, লালীর সাথে কথা বলে, লীলাকে মনখুলে আদর করে। দিপালীর মনে হয়, নি:সঙ্গতা কষ্টদায়ক হলেও সেই কষ্টটা অন্তত সৎ। এর অনেক রূপ নাই। একটাই রূপ। সেটাতে কোন ভেজাল হাসি নাই, গোপন উদ্দেশ্যও নাই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মলয় সাহা খুঁজতে খুঁজতে চলে আসে গোয়াল ঘরের কাছে। “তোমারে জানি ক্যামন দেহা যায়। মার বাড়িত থিকা আওয়ার পরথে কিরম জানি তোমার খুশী নাই। কি হৈছে তোমার?”
দিপালী ছোট, ধারালো চোখে তাকালো স্বামীর দিকে। শীতের সকালের আলো ততটা খাড়া আর শক্ত হয় নাই। দিপালী দেখলো মলয়ের মুখে একটা মোলায়েম আলো তার চোখের ভাঁজের দিকে খেলে যাচ্ছে। “আইজকা সংক্রান্তির মেলায় কহন যামু আমরা?”
“তুমি কথা ঘুরাও ক্যা? মেলাতে তো যামুই। কিন্তু তুমি গাল ফুলায়া রইছো তো রইছোই।” আরো একটু নরম হয়ে দিপালীর পাশে বসতে বসতে বললো, “আমি যে তোমারে আনতে যাই নাই, এন্নাইগলাই তোমার রাগ?” শিশুদের সাথে বড়রা যেভাবে কথা বলে রাগ ভাঙ্গায় সেরকম করে দিপালীর থুতনি আঙ্গুল দিয়ে তুলে ধরে বললো, “ভিতরে রাগ রাইখা দিলে শইল খারাপ হয়।”
দিপালী ফুঁসে উঠার মতো ঝাঁট করে উঠে চলে গেলো ঘরের দিকে, কিন্তু উঠানে শ্বাশুড়ির সাথে দেখা হতেই তার নিজেকে সামলে নিতে হলো।
ধান কাটা হয়ে গেছে, ধান মাড়াইও হয়ে গেছে। এইবার আমন ধানের ফলন ভালো ছিলো। বাজারে দামও পাওয়া গেছে মোটামুটি খারাপ না। পুরা ডিসেম্বরের শেষ থেকে এই জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এমন গেছে যে দম ফালানোর উপায় ছিলো না। দুই জন কামলাসহ মলয় নিজে, মা, বউসহ সারা দিন কাজ করেও কুল পাইতো না।
মলয় সাহা আর কোন কিছু করে না, শুধু কৃষি কাজ। পেশাদার কৃষক। জায়গা জমি তার ভালোই আছে, প্রায় দুই একর জায়গা। কিছু জমিতে সবসময়ই ধান ফলায়, আর বাকি অংশে কখনো করলা, কাঁচামরিচ, শসা ফলায়, আবার কখনো সরিষা। নিজেদের খাবারের জন্য ঘরে প্রায় সবই ফলে। মাছ ধরে বিল থেকে। মাঝে মধ্যে, সব সময় না। বেশিরভাগ সময় মাছ কিনেই আনতে হয় বাজার থেকে। একটা নৌকা আছে তার। নৌকার এক গলুইতে মেয়ের নাম আরেক গলুইতে বউয়ের নাম লিখে রেখেছে সে খোদাই করে। বড় বড় হরফে। বর্ষার সময় নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়াই যায় না। আর এম্নিতেও তার নৌকা বাইতে ভালোই লাগে। মাঝে মাঝে মা-বউ-মেয়ে সবাইরে নিয়ে নৌকায় করে বিলে ঘুরতে যায়। বিলে অনেক শাপলা ফুটে থাকে, দুপুরের রোদে শাপলা দেখে ঘুরতে ঘুরতে মনটা ফুরফুরা লাগে।
তবে শহরে যাওয়া হয় কম। এখান থেকে শহরে যাওয়া অনেক ঝাক্কির। বর্ষা কালে তো নৌকা আর শুকনা কালে সাইকেল বা পায়ে হেঁটে আসতে হয় প্রায় মাইল খানেক। তারপর মোটর সাইকেল বা ভ্যানে করে যেতে হয় সিএনজি অটোরিকশা, টমটমের মোড় পর্যন্ত। শেয়ারে ভাড়ায় চড়ে বাস স্ট্যান্ড, এরপর বাসে চড়ে যেতে হয় টাঙ্গাইল শহর। সার, জামা-কাপড়, পুজার জিনিষপাতি কিনতে শহরে যেতে হয় বেশিরভাগ সময়। কখনো কখনো বউ নিয়ে শহরে যায় মলয়।
শহর আবার দিপালীর কাছে অনেক আনন্দ লাগে। বড় বড় বিল্ডিং, গাড়ির হর্ণের শব্দ ওর ভাল্লাগে। ভিড়ের মধ্যে মানুষ এঁকে বেঁকে, অল্প দৌড়ানির মতো গতিতে মেইন রোড পার হয়, এইটা দেখতে তার ভয়ে মোড়ানো খুশী লাগে। কিন্তু বলা হয় না কাউকে। মাঝে মাঝে মনে হয় জবার বাপরে ধরে বসায়া এসব গল্প বলে, কিন্তু করা হয় নাই কখনো।
গত পরশু দিপালী বাড়ি আসছে, বলা যায় শহর ঘুরেই আসছে। প্রথমে গেছিলো মীর্জাপুর সরকারি হাসপাতালে। দেড় সপ্তাহ আগে দুপুরের রান্নার জন্য মিষ্টি কুমড়ার শাক আর ফুল তুলছিলো, তখনই মোবাইল ফোনে খবর পায়, বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হন্তদন্ত হয়ে জবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। হাসপাতালের গল্পটা ভালো ছিলো, শহরের মধ্যে হাসপাতালটা দেখতে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বড়ো একটা বিল্ডিং। অনেক মানুষ। অনেক ভঙ্গি। পরিবারের সদস্য ভাই, ভাইয়ের বৌ, ছোট বোন, ছোট বোনের জামাই এদের সাথে দেখা হয়, সবাই অনেক আগ্রহ নিয়ে গল্প করে। বাবার অসুখের মধ্যে একটা দু:খ-দু:খ আনন্দে ছিলো সে। এরপর বাড়ি যায়, নিজের বাড়ি, মায়ের বাড়ি। বাবার অসুখ, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক এরকম কিছু না হওয়ায় ছোট বোন আর ভাইয়ের পরিবার চলে যায়। দিপালী থেকে যায় মার সাথে।
দিপালীর মায়ের বাড়ি তার শ্বশুরবাড়ি থেকে বেশ ছোট, কম জায়গার একটা ছোট্ট টিনের ঘর। স্কুলে পড়া কোন বান্ধবীরা এখন আর নাই গ্রামে, কিন্তু পাশেই থাকা কাকাতো-পিশতুতো ভাইবোনদের সাথে আড্ডা দিতেও তার ভালো লাগে না। মার সাথে তার কাজে সহযোগিতা করা, কথাবার্তা বলে সময় কাটাতে, বাবার সাথে জবার খেলা দেখতেই মন শান্তি লাগে তার। এর আগের দুই সপ্তাহ শ্বশুরবাড়িতে অবস্থা এমন ছিলো যে এক ফোঁটা দম ফেলার কোন উপায়ই ছিলো না। খাবার-দাবার রান্না করে চকে যাও ভাত নিয়ে স্বামীর জন্য, কামলাদের জন্য, তারপর আবার বাড়িতে মেশিন দিয়ে ধান ঝরানোর পর সেগুলা গুছাও।যদিও তার শ্বাশুড়িও সারাক্ষণ কাজ করছিলো, আর স্বামী তো সারাক্ষণই কাজ করে, কিন্তু দিপালীর এতো কাজ করতে খুব ক্লান্তির চাইতে বড় কথা হচ্ছে, ওর বেশি একটা ইচ্ছাই করে না। মার বাড়িতে এসে তার আর যেতেই ইচ্ছা করছিলো না। এখানেও কাজ করতে হয়, কিন্তু কাজ না করে এখানে বসে থাকলে খারাপ লাগে না, অপরাধবোধও লাগে না।
সপ্তাহ ঘুরতেই একদিন মা বল্লেন, “কীরে দিপু, তুই দেহি বাড়িত যাওনের নাম ন্যাস না? জামাইবাবারে ফুন দে, আইসা তরে নিয়্যা যাইক।”
দিপালী রোদে শুকাতে দেয়া লাল মরিচ ঢুকাচ্ছিল বয়ামে, কথাটা গুলতির মতো কানে এসে ঢুকে। ঝাঁট করে চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকায়। “ক্যান, থাকলে তুমার কি অসুবিদ্যা?”
“আমার আবার কী অসুবিদ্যা! তোর বাপে কইলো, জামাই-হৌরি রাইখা এতো দিন বাপের বাড়ি থাকন ভালা দেহায় না। মাইনষে ভালা কয় না। স্বামীর বাড়ির বাইরে বেশি দিন থাকতে নাই। অমঙ্গল হয়।”
“মায়ের বাড়ি, নিজের বাড়িত থাকলেও অমঙ্গল হয়?”
“ঝগরা টগরা কইরা আসছত না কি,” বলে দিপালী রানীর মা প্রতিমা রানী হাসলেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস দিপুর সংসারে কোন অশান্তি নাই।
দিপালী কোন উত্তর না দিয়ে ঘরের বাইরে, ছোট উঠানের কোনায় পেয়ারা গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। চোখ ফেঁটে পানি আসছে। তার মনে হয় দুনিয়ার কোথাও তার কোন জায়গা নাই, নিজের জায়গা। কান্নার তরল পানি কিছুক্ষণ গড়ায়ে পড়তে পড়তে তার ফোঁপানি আসে, মুখে হাত দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। দুই ভ্রুর মাঝ খানে ভাঁজ পড়ে। কপালের উপরের অংশ, চোখের কোনা লালচে-বেগুনি হয়ে উঠে। মেজাজ খিটখিট করছে। দশ বছর আগে সতের বছর বয়সে যখন তার বিয়ে হয়, তারপর থেকে এই বাড়িতে এসে কখনোই একটানা দুই সপ্তাহ থাকতে পারে নাই বা থাকা হয় নাই; মানুষ এই ভাববে, সেই ভাববে এইসব শুনার ভয়ে থাকার সাহসও হারায় ফেলতো।
সে জবার বাপকে ফোন দিয়ে বলে আজকেই বাড়ি ফিরছে। একটু পরেই রওনা দিবে। বলে, তাদের নিতে সিএনজির মোড়ে আসতে।
জবাকে নিয়ে গ্রাম থেকে হেঁটে প্রথমে বাজারে আসলো। ভাড়ার অটোতে চড়ে নাটিয়াপাড়া মোড়ে পৌঁছায়। এরপর বাসে চাপতে হবে। বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলো। কিন্তু চাপ দিয়ে থামায়া রাখা অভিমান আর রাগে ভেতরটা গিরগির করতে থাকে। খুবই অস্থির-অস্থির লাগছে। একবার জবার হাত ধরে থাকে, আবার হাত ছেড়ে এদিক-ওদিক একটু হাঁটে।
মাঝে মাঝে নিজে নিজেই শব্দ করে কী কী বলছে। সামনে রিকশাভীড়ের দিকে তাকায় থাকতে থাকতে বলছে: “আমাগো কি আসলে কোন বাড়ি আছে? বাপের বাড়ি গেলে কারো লগে দেহা হৈলেই বলবে, কবে আইছত, কবে যাবি? আবার জামাইর বাড়িতে গলা খুইলা কথাই কওন যায় না, কইলে কয়, যাওগা বাপের বাড়ি।” জবার দিকে তাকায়া না বল্লেও জবা মায়ের দিকে তাকায়া শুনতে থাকে। তারপর বলে, “মা, তুমি একটা সিমেন্টিটের ঘর বানাইতে পারবানা তোমার লাইগা? সিমেন্টিট তো শক্ত, কেউ নিবার পারবো না।”
দিপালীর ঝরে না পড়া, পানি ভরা চোখ একটু স্থির হয়ে তাকায় থাকলো মেয়ের মুখের দিকে। সে দিন তারা মা-মেয়ে সন্ধ্যা জমার আগেই বাড়ি ফিরে আসে। ফিরে আসার পর থেকে সে তেমন কোন কথাবার্তা বলছে না। মনের মধ্যে কিছু পর পর ক্যামন জ্বালা-জ্বালা ধরে। কোন কিছুই ভাল্লাগে না। কিন্তু আজকে একটু পর পৌষ-সংক্রান্তির মেলায় যাবে ভেবে তার কিছুটা ভাল্লাগছে, গতকালের চাইতে।
মলয় এসে তাড়া দিয়ে গেলো রেডি হতে। সন্ধ্যার সময় মেলা শেষ হয়ে যাবে। দুপুরের বেলা পড়ার আগেই তারা বাড়ি থেকে বের হতে চায়।
একদিনের এই মেলা যতটা মেলা, ততটাই পৌষ সংক্রান্তির সনাতনি আচার। গ্রামের প্রায় সবাই ওখানে যায়। হিজল গাছের তলায় কীর্তন হয়। ওখানে অনেকে অনেক কিছু মানত দেয়। খাবার-দাবার, ফুল, গরুর দুধটা বেশি দেয়, ঢেলে দেয় হিজলের গোড়ায়। আর একটা দান বাক্স থাকে, মোটামুটি সামর্থ মতো ওখানে টাকা পয়সাও দেয় সবাই।
অনেক পথ হাঁটতে হয় বলে মাকে বাড়িতে রেখে মলয় বউ আর মেয়ে নিয়ে মেলায় চলে আসে বিকালের আগে আগেই। চারপাশে বেশিরভাগই সরিষা ক্ষেত। হলুদ সরিষার ফুল ফোটা ক্ষেতের চিকন আইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে লোকে আসছে। নারী, পুরুষ শিশু, সবার পরনেই নতুন-নতুন পোশাক।
গত বছরের তুলনায় এই বছর মেলার জায়গা আরো বেড়েছে। ধানকাটা শেষ হবার পর মেলা চত্বরের পেছনের দিকটা মাটি ফেলে চওড়া করা হয়েছে। অল্প ঘাস আর বেশিরভাগই মাটি-মাটি। সামনের দিকে পিচঢালা রাস্তা থেকে চিকন একটা মাটির পথ চলে আসছে মেলা প্রাঙ্গনে। কোন গেইট টাইপের কিছু নাই, কিন্তু একটা চওড়া অংশকে বাদ দিয়ে দুইপাশ ধরে যেভাবে দোকান বসেছে, তাতেই চওড়া অংশটা গেট ছাড়া প্রবেশ পথ হয়ে গেছে। মানুষ ঢুকছে এই দিক দিয়ে আবার অনেক মানুষ ঢুকছে হিজল গাছের পেছন দিয়ে, সরিষা ক্ষেতের আইল দিয়ে হেঁটে এসে একটু উপরে উঠে মেলায় ঢুকছে।
হরেক রকমের জিনিষ বসেছে মেলায়। বিক্রেতারা কেউ কেউ মাটির উপর পাটি বিছায়ে বসে সামনে সাজিয়ে রেখেছে মাটির তৈরি জিনিষপত্র: হাড়ি পাতিল, প্লেট, বাটি, কলস, মাটির ব্যাংক, মাটির পুতুল, খেলনা হাড়ি পাতিল, পাখি। এক দোকানে কাগজের ফুল বাতাসে ঘুরঘুর করে উড়ছে – ঘুরে কাঠির সাথে লেগে থেকে ফ্যানের মতো ঘুরছে। ম্যাজেন্টা, নীল, সবুজ রঙ ঘুরঘুর করতে করতে রঙ ল্যাপ্টে গিয়ে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। ওইটাকে আর ফুল মনে হচ্ছে না। জবা এক দৃষ্টিতে তাকায় থাকলো। তারপর বাবার দিকে তাকায়া খিক খিক খুশীর হাসি হাসলো। কোন কিছু কেনার এখনো বায়না ধরে নাই।
প্লাস্টিকের হেলিকপ্টার উড়ছে একটা দোকানে। এক ঝাঁক প্লাস্টিকের পেঁচা সারিবদ্ধভাবে বসে আছে আরেকটা দোকানের তাকে। নব ঘুরালেই পেঁচাগুলা মাথা উপরে নিচে ঝাঁকায়। বাতাসে উড়ছে হৃদয়-আকৃতির লাল, নীল, সবুজ, হলুদ এক দল বেলুন। একটা দোকানে অনেক গয়না পাতি, কানের দুল, গলার মালা, কাঁচের চুড়ি। লিপস্টিক, টিপ, সিঁদুর, শাঁখা আছে। প্রায় একই রকম আইটেম বেশ কয়েকটা দোকানে বিক্রি হচ্ছে।
বারানাসির সাইঁদের মতো একজন বাবা লাল কাপড় পরে একটা লাল চাদর বিছিয়ে বসেছেন। মাথায় লম্বা চুল, ড্রেডলকড। গলায় অনেকগুলা মালা। উনি সিংগায় ফুঁ দিচ্ছেন। উনাকে ঘিরে এক দল লোক বসে আছে। মলয় কিছু পর পর মোবাইল ফোন দিয়ে মেলার ছবি তুলছে, মেয়ের সাথে সেল্ফি তুলছে।
এরকম না যে খাবারের দোকান আলাদা, বরং এদিক ওদিক ছড়ানো ছিটানো। মিষ্টির দোকান একটু বেশিই। একটা দোকানে বিশাল এক কড়াইতে জিলাপি ভাজা হচ্ছে। কাপড়ের ভেতর জিলাপীর থকথকে কিন্তু কাপড়ে আঙ্গুলের চাপ প্রয়োগে ঝরে পড়ার সামর্থ্য থাকা তরল আটা জাতীয় পদার্থ, তেল ভরা কড়াইতে গোল গোল ঘুরানিতে, নেমে গোল হয়ে এসে জিলাপী হচ্ছে। দিপালী জিলাপীর দোকানের সামনে দাঁড়ায়া দেখতে থাকে। দিপালীর মনে হয় এক বিশাল কুয়ায় ফুল ফুটেছে। সে একদৃষ্টিতে তাকায় থাকলো। তেলের ভেতরে ফুলে ওঠা জিলাপীর উপর জিলাপীঅলা একটা ছিদ্র ছিদ্র চ্যাপ্টা চামচ দিয়ে তেল দিচ্ছে ছুপছুপ। দিপালী ভাবলো, গরম তেলে ফুল ভাজলে ফুল কি ফুল থাকে? জবা মায়ের হাতটা একটু নিচের দিকে টান দিয়ে বল্লো, “মা, উই যে, আব্বায় ডাকে, চলো।”
তারা এক সাথে হিজল তলার দিকে গেলো। কীর্তন চলছে। হাতভর্তি খাবার দাবারসহ অনেকে দাঁড়ায়া, অনেকে বসে শুনছেন। একজন একটা ছিদ্রঅলা এবং তালা দেয়া বাক্স নিয়ে ঘুরে ঘুরে টাকা তুলছেন।
জবার হাতে প্লাস্টিকের নব ঘুরালে মাথা নাড়ানো প্যাচা দুইটা, দুই রঙের, হলুদ আর লাল। আর এক প্যাকেট চিপস। মলয় বললো, “ তুমি কিছু কিনবা না, দিপালী? আইলা মেলায়, কিছু না কিনলে কী হয়! মেলায় মুখ ব্যাজার করে থাকলে ঠাকুরও ব্যাজার হয়।”
এতক্ষণের ফুরফুরে শান্ত মনটা যেন একটা ঝাক্কি খেলো। সে তার লাল ছাপা শাড়ির আঁচলটা টেনে মুখের উপর ধরলো, য্যানো ঠোঁট ঢেকে থাকে। তারপর একা একটু হেঁটে কীর্তন-শুনাদের পাশে গিয়ে বসে পড়লো। মলয় বললো, “আরে বইসা পড়লা ক্যা, সুরুজ ডুবার আগে তো বাড়ি ফিরতে হৈবো।” বলে সে-ও দিপালীর পাশে বসলো। পুরা বসা না, হাঁটু ভাঁজ করে আধা বসা। কিন্তু দিপালীর উঠার কোন ক্রিয়া না দেখে সে পুরাপুরি বসে পড়লো জবাকে নিয়ে।
আকাশে সূর্য তখন সাড়ে চারটা-পাঁচটা সময়ের। হালকা কুয়াশা জমে আসছে হিজল তলার পেছনের সারি সারি সরিষা ক্ষেতে আর তারো পেছনের বিলের পানির রেখার উপর। দিপালীর চোখ বিলের পানির দিকে। সে হঠাৎ করে মাথা ঘুরায়ে মলয়ের দিকে তাকায়া বলে, “আইচ্ছা, বিলের এধারেও মাটি, ওই ধারেও মাটি, দুই ধারেই দুই পার। বিলের ঘর কোন পার?”
“বিলের তো ঘর নাই। বিলের শুধু পার আছে। হিসাব করলে আবার দুই পারই বিলের ঘর।” বলে মলয় একটু হাসি দিয়ে হাল্কা হতে চাইলো। কিন্তু মনের ভেতর একটা অবিশ্বাস্য কথা শুনার বিহবলতা। তার চোখ দিপালীর সিঁদুর পরা প্রসাধনহীন মুখের এদিক ওদিক নানা দিকে ঘুরছে।
“আমিও তো বিল। বিলের পানি। নিজেরে বিলের পানিই নাগে।” য্যানো এই আবিস্কারে দিপালীর জ্বালা একটু ঠান্ডা হয়ে আসে। মলয় থেকে চোখ সরায়া সে দূরবর্তী বিলের পানির ঝাপসা চকচকে কিছুক্ষণ তাকায় থাকে। তারপর চোখ সরায়া নিয়ে আসে কীর্তনের কর্তালে।
মলয় আহত চোখে তাকায় থাকে দিপালীর দিকে। তার মনে হয় এক ঝাঁক কচুরিপানা ফুল ফুটে আছে দিপালীর মুখে।
প্রচ্ছদ ছবি: ফটোগ্রাফ এবং স্কেচের সমন্বয়ে ডিজাইন করা/ শামীমা বিনতে রহমান

