শামীমা বিনতে রহমান

 

ভোরের দিকে, মানে সূর্য তখনও উঠে নাই, বাসটা বামদিকে বাঁক নিল। আমার পাশে সামির তখন ভোর হওয়াকে মোবাইল ক্যামেরায় আটকানোর চেষ্টা করছিল। সামিরের সামনের দিকে রণিও তাই করতেসিল। আরো অনেকেই ভোর আটকাচ্ছিল। দুইপাশে ঘন নীল থেকে ফিকা-ফিকা রঙে মিশ খেয়ে যাচ্ছিল হবিগঞ্জের জালালী কৈতর। মানে ছোট ছোট টিলা। বাতাসটা পাল্টায়া গেল।

আমরা ঢুকে পড়েছিলাম তখন চুনারুঘাট এলাকায় আর বাস আগাচ্ছিল বেগম খান-চান্দপুর চা বাগানের দিকে। সিঁথি করে চুল আঁচড়ানোর মতো, না, মিলিটারী লেফট-রাইট লাইনের মতো লাগতেসিল, চা গাছের সারি। মিলিটারীর সাথে উপনিবেশিক সময়ের সমকালীনতার মধ্যে একটা মিল মিল লাগে।

সকাল সকাল এসেই জমায়েত হয়েছিলেন গানের দল, আঁকিয়ে, ভাস্কর্য শিল্পী, কবি-লেখক, প্রকাশক, অ্যক্টিভিস্ট, অনেকেই।

সকাল বেলায় কফিল আহমেদ স্থানীয় এবং ঢাকা থেকে আগতদের সাথে কথা বলছেন, শুনছেন।

বাস এসে থামলো একটা হাট-বাজারের মতো জায়গায়। কফিল আহমেদ, যিনি গান লিখেন না, গান জন্মায় তার ভিত্রে আর তা গলা দিয়ে স্বর হয়ে, সুর হয়ে ফোটে; তিনি “হরিনেরা কি জানে/ ভালোবাসি তোমারে” এইরকম ভঙ্গীতে এসে আমাদের, মানে আমরা যারা শহুরে ক্রিয়েটিভ বলে কথিত এবং প্রচারিত এবং যারা সুনীলের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ উপন্যাসের মতো একটা জার্নিতে ছিলাম; তাদের গলায় তুলে দিলেন:”প্রাণে প্রাণ মেলাবোই/ বলে রাখি”।

কিন্তু ঢাকা থেকে যারা আসছেন, তারা যে কেউই বীরেনের বিয়েতে আসেন নাই, এটাতে খুবই অবাক নির্মলা রায়। ওইদিন,শুক্রবার চান্দপুর চা বাগান এলাকায় ৩টা অনুষ্ঠান চলতেসিল। ৩টাতেই গান হচ্ছিল, কীর্তন হচ্ছিল। একটা শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান, মৃত ব্যক্তির মরে যাওয়ার উৎসব। একটা “ভূমি রক্ষা কমিটি” এবং “চা জনগোষ্ঠী ভূমি অধিকার ছাত্র যুব আন্দোলন” আয়োজিত সমাবেশ, র‍্যালি ও গানের অনুষ্ঠান, যেইটাতে অংশ নিতে ভোর বেলায় গিয়া পৌঁছালাম আমরা অনেকেই। আরেকটা ছিল বীরেনের বিবাহ অনুষ্ঠান।

বাজারের মধ্যে বিশাল এক রেইন ট্রি। মরে যাওয়া ফার্নে মোড়ানো ডালগুলা ক্যামন ভাস্কর্যের মতো ফুটে আছে।

বীরেন হলেন রমেশ রায়ের ভাইস্তা। আর চা-বাগানের সাবেক কর্মী রমেশ রায় একসময়কার ডাকসাইটে অপেরা পরিচালক, বড় বড় সাদা গোঁফে আঙ্গুল বুলায়ে অপেরার নাম উচ্চারণ করেন ‘বীনাপানি অপেরা’। বৃষ্টির মধ্যে সাদা শার্ট-প্যান্টের সাথে কালো বুট পরে ঘরে ঢুকেই আমাদের জানালেন বীরেনের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান থেকে ফিরলেন কেবল। আর নির্মলা হলেন আবার সম্পর্কে রমেশ রায়ের ছেলের বউ ।

চা গাছের তলায় অসংখ্য ঝরা পাতা আর উপরের দিকে নতুন সবুজ চা পাতা। ইহা বসন্তকাল।

চা বাগানে বসন্ত পুরা উচ্ছ্বাসে ঝরে পড়ছে-হলদেটে সবুজ কচি পাতার সাথে ঘন সবুজ পাতার পাল্টাপাল্টি।

কিন্তু আমরা কেউই বীরেনকে চিনি না। কখনো দেখিও নাই, নামও শুনি নাই। আর আমরা মানে, ৩ সদস্যের ইস্যু ভিত্তিক  অনুদল-সামির, ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট, যে বাংলা কথা বলে ইংরেজি ব্যকরণে আর রণি, অডিও আর্টিস্ট, যে নদীয়ার বাংলা ভাষায় কথা বলে আর আমি যে, বাংলা-ইংরেজি কোনটাই ঠিকঠাকমতো বলতে পারি না। খপ করে নির্মলা দি’কে জিজ্ঞেস করলাম, বীরেন এত বিখ্যাত ক্যান?

“ বীরেন তো আমার দেওর। খুব সুন্দর। সবাই চিনে তাকে। ঢাকার মানুষও ওকে চিনে। আপনারা থাকবেন না বীরেনের বিয়েতে? আজকে হলুদ অনুষ্ঠান আর রোববার বিয়ে। রোববার তো আমাদের ছুটি।”

চান্দপুর চা বাগান এলাকার কুটিয়াল গ্রামের ভেতরকার রাস্তা

 

জয়দেব কালিন্দী, চাবাগানের শ্রমিক, উনার সাথে যখন সকালে দেখা-পরিচয় হলো, স্থানীয় রেস্টুরেন্টে, তখন উনিও আমাকে বলসিলেন বীরেনের বিয়ের কথা আর আমরা কি বীরেনের বিয়ে পর্যন্ত থাকবো কি-না।

তো বীরেনের বিবাহ আর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের কীর্তনের স্বরে-সুরে রাধা-কৃষ্ণ, দুর্গা আর অনুকূল চন্দ্র রায়ের মন্দিরের পেছনের মাঠে ছিল “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” বা “স্পেশাল ইকোনমিক জোন” আরো ছোট করে “জোন”র বিরুদ্ধে চা-শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলনের সমাবেশ, র‍্যালি, ছবি আঁকা, গান অনেক কিছু। সেইসব অবশ্য বীরেনের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে কি যোগ আর বিয়োগ করসিল, জানি না আমরা কেউই, কিন্তু আমরা এইটা জানসিলাম, ওই দিন শুক্রবার, চা শ্রমিকদের সমাবেশ অনুষ্ঠানের জন্য আশেপাশের ৪টা চা-বাগান থেকে শ্রমিকরা ছুটি নিয়েছিলেন।

উনার বাবা-মা এবং বউ চা শ্রমিক, কিন্তু অফট্র্যাক। তিনি দেশের শহরে শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। চা-কোম্পানীর বেতন তার কাছে শুধু কম মনে হয় তাই-ই না, খুবই আনন্দহীনও মনে হয় ইনার।

সংবাদপত্রের খবর বলছে, ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চাশ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষকে ডেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির বিষয়টি জানান এবং যেকোনো মূল্যে এটি করবার ‘ঘোষণা’ দেন। আর তার পরের দিন থেকেই চান্দপুর চাবাগানের জমি রক্ষা আন্দোলনটি জানবাজি রেখে দাঁড়িয়ে যায়। তৈরি হয় ১১১ সদস্য বিশিষ্ট ‘চান্দপুর-বেগমখান চাবাগান ভূমি রক্ষা কমিটি’। ২০১৬ সনের ১ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি বহরের খবর পেয়ে আবারো উত্তাল হয়ে ওঠে চান্দপুর। তীর-ধনুক, লাঠি, মাদল, ঢোল নিয়ে জমি বাঁচাতে চান্দপুরে অবস্থান নেয় হাজারে হাজার নারী ও পুরুষ।

বাসুদেবের পূজা ওখানে ধর্মীয় চল। আর রাধা-কৃষ্ণ তো আছেই।

মাটির দেয়ালে এমন আর্ট, চা শ্রমিক বাড়িগুলাতে সাধারণ, ভিজ্যুয়াল আর্টিস্টরা তো চোখ মেলে তাকায়া থাকবেন, স্বাভাবিকই।

আমরা আসলে এক টুকরা অদ্ভুদ বাজারে, যেখানে ২ টাকায় ঢাকার ১০ টাকার লুচি মেলে, ২২ টাকায় ২ জন সবজি-লুচি নাস্তা করে ফেলতে পারে অনায়াশে, সেরকম জায়গায় খেয়ে চাবাগান সংলগ্ন কুটিয়াল, ঝাউভাঙ্গা গ্রাম ঘুরে নির্মলাদের বাড়িতেই আড্ডা দিচ্ছিলাম। নির্মলা গল্প করে যাচ্ছিলেন অনেক ব্যক্তিগত-অব্যক্তিগত বিষয়ে।

তার স্বামীর সাথে তার “লাভ ম্যারেজের” গল্প শুনালেন। বল্লেন, “লাভ ম্যারেজ কইরা বিয়া করছি। সত্য কথায় ইয়া থাকে না। শরম থাকে না। সত্য কথা কি কেউ আটকায়া রাখতে পারবো? মোটেও পারবে না। গত ১৮ বছরের সংসারে আমাদের কুনো ঝগড়া হয় নাই”।

নির্মলা তার ‘লাভ-ম্যারেজের’ গল্প বলতে বলতে এরকম হেসে উঠতেসিলেন।

তার প্রেমী হৃদয় যেন জনস্ত্রোত মিশে গেল। বল্লেন “আসলে তোমরা আমারে কী যে ভাবছো, আমি তো কইতে পারবো না। নিজের মতো ভাইবা নিসি। হি হি হি। . . . এখন যদি আপনারা সরকাররে বুঝাইয়া বলতে পারেন জোন না করতে, তাইলে আমরা ভাতে-পানিতে বাঁচি”।

গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের ওখানেও আমি খেয়াল করসি, উনারাও আপনি-তুমি মিশায়া কথা বলেন বহিরাগতদের সাথে।

নির্মলা কিন্তু চা শ্রমিক না, ও রাস্তা বানানোর কাজ করে। ওর স্বামীও চা শ্রমিক না, কিন্তু ওর শ্বাশুড়ি চা বাগানের শ্রমিক। আমরা যেই বাসাটায় বসে নির্মলার সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম, ওই বাসাটা কোম্পানীর দেয়া চা শ্রমিকদের বাসা। এই বাসার ভাড়াও কেটে রাখে কোম্পানী।

খেলার ফাঁকে, ক্যামেরার চোখের দিকে হাসি ছুঁড়ে দিল শিশুটি

কেম্পানী মানে ডানকান ব্রাদার্স (বাংলাদেশ) লিমিটেড, যেটার অফিসিয়াল নাম ক্যামেলিয়া পিএলসি গ্রুপ কোম্পানী, পুরা দুনিয়াতে যারা বাৎসরিক ৮০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করে চায়ের বাজারে ব্যাপক প্রভাবশালী। এরা নিজের দেশ ছাড়াও ব্রিটিশ শাসনের মধ্যে থাকা এখন সার্বভৌম দেশ হয়ে যাওয়া দেশগুলাতে চা উৎপাদন চালায়ে যাচ্ছে।

চা, মানে ঘুম থেকে উইঠা এক কাপ চা না খাইলে যেমন অনেকেই গা ঝাড়া দিয়া বসতে পারে না, আবার অনেকেরই ‘মর্নিং লাক্সারি’ মানে হাগু হয় না। সেই চা-যেই চায়ের কাপে নাকি এমন ঝড় বয়, সময়ে সময়ে, সরকার ক্ষমতা থেকে পড়ে কাপে এসে ধরা খায়।

জয়দেব কালিন্দীকে জিজ্ঞসে করলাম, জোন হৈলে সমস্যাটা কি? উন্নয়ন হবে তো।

জয়দেব কালিন্দী, যিনি এই উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না, ডানকান কোম্পানীকে খাজনা দেয়ার পরও, ধান-সবজি চাষ করার পরও, সরকার কীভাবে পতিত জমি/ খাস জমি বলে, তাদের জমি নিয়ে গেল!! তিনিই বল্লেন যে তিনি শুনেছেন, জোনে সরকার বিমান ঘাঁটি করবে।

কীর্তনীয়া জয়দেব আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। তার বাঁক খাওয়া ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুলে একটু বামে টেনে নিয়া এসে বল্লেন, এইখানেই ফ্যাকরা।

ফ্যাকরাটা কি?

এইটাই তো ফ্যাকরা। জোর করে জোন করতেসে তো।

জোর কেন?

সরকার বলে সরকারের জমি। সরকারের জমিতে আমরা নাকি দখলদার। কিন্তু আমরা তো খাজনা দেই। খাজনা দিলে সরকারের খাস জমি হয় ক্যামনে? এই ধরেন, ওই জোন এলাকায় যার যত জমি, সেই অনুযায়ি খাজনা দেই। ধরেন আমার আছে ২ কেয়ার, মানে ১ একরের কাছাকাছি। খাজনার সিস্টেম আছে। জমির-সাড়ে ৩ মন চালের পরিমান দাম, রেশনের হিসাবে কাটা হয়। রেশনের হিসাবে সাড়ে ৩ মন মানে ২৮০ টাকা।

চান্দপুর চা বাগানে এই মরিচটার দুইটা নাম: কৃষ্ণ মরিচ, আবার সূর্যমুখী মরিচ।।

 

নানা পূজার অনুষ্ঠান, চা বাগানে বছর জুড়েই চলতে থাকে।

রেশনে ১ কেজি চালের দাম তিনি ধরেন ২ টাকা করে। জয়দেব আবার বলতে থাকলেন “ গত দেড়শো বছর ধরে আমরা খাজনা দেই। আর এখন কোম্পানী বলে, আমরা নাকি খাজনা দেই না। আর সরকার বলে এটা আমার জমি”।

ওই জমিতে কি হয়?

ওইটা ২ ফসলী জমি। ধান, সবজি চাষ করি। আবার ধরেন ছেলে-মেয়ের বিয়ে বা কোন অনুষ্ঠানের জন্য ওই জমিই বন্ধক রেখে অনুষ্ঠান সারি। আমাদের তো আর চাষবাসের জায়গা নাই।

তাইলে এখন কী করবেন?

এখনও সিদ্ধান্ত হয় নি তো। আজকে ২ বছর হলো হরতাল চলতেই আছে। কোন সিদ্ধান্ত হয় নি। আমরা কোম্পানীকে বলছি, আমাদের ডক্যুমেন্ট দেন। কোম্পানী তো কোনদিন আমাদের খাজনার কাগজপত্র দেয় নাই। এখন সরকার যখন খাস জমি বলতেসে, কোম্পানী তো খাজনার জমি দেখাইতেসে না। আমরা যেভাবে আছি! নৌকার মধ্যে আছি আর কি! দুলতেসি।

এই সেই জোন এলাকা – ৫১১ একর বিস্তৃত আবাদী জমি, যেটার খাজনা গত দেড়শ বছর ধরে চা বাগান শ্রমিকরা ডানকান কোম্পানীকে দিয়ে আসছিলেন। ২০১৪ সালে সরকারি সিদ্ধান্তে সারাদেশে ১০০টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন স্থাপন সিদ্ধান্তের এটি একটি, যার পরিচালনায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

“জোন”র বিরুদ্ধে ১০ মার্চের প্রতিবাদী সমাবেশে চা শ্রমিকদের একাংশ।

 

স্পেশাল ইকোনমিক জোন, বাংলায় যেটাকে বলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আর স্থানীয় ভাবে পরিচিতি পাওয়া “জোন”র বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে শ্রমিকদের প্রতিরোধ।

হবিগঞ্জের এই চুনারুঘাট, যেটা ভ্রমন পিয়াসীদের কাছে রেমা-কালেঙ্গা অভায়ারন্য আর সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের জন্য খ্যাত, আবার ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা আসাম পাড়ায় ২০১৪ সালে আসামের বিপ্লবী সংগঠন, ভারত সরকারের ভাষায় চরমপন্থী/বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফা (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম)র ঘাঁটি হিসাবেও র‍্যাবের খাতায় পরিচিত। এই চুনারুঘাটে এখন চা শ্রমিকরা ৫০০ একরের বেশি আবাদী জমি সরকারি উন্নয়ন থেকে রক্ষা করার জন্য জোট বেঁধেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.