শামীমা বিনতে রহমান

চরণ সরেনের সঙ্গে আড্ডা, একেবারেই কোন সাক্ষাৎকার নয়।

 

 

তখন দুপুর ধাপ করে নেমে বিকাল হচ্ছিল মাদারপুর গ্রামে। চরণ সরেনের তাঁবুর সামনের ফসলি ক্ষেতের নারার মধ্যে সূর্যের হলুদ আলো রিফ্লেক্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল বেসরকারী সংস্থার দেয়া সাদা তাঁবুতে, মাটিতে।

আমরা আড্ডা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি দেখাচ্ছিলেন তার পায়ের বিভিন্ন জায়গায়, হাতে ছররা বুলেটের আটকে থাকা ছোট ছোট স্প্রিন্টার। শক্ত শক্ত-ছোট ছোট গোল গোল টুকরার মতো। আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়।

ধুসর ডটের মতো যে দাগ দেখা যাচ্ছে, সেটা পুলিশের ছোঁড়া ছররা বুলেটে ক্ষত দাগ, চিকিৎসার পর।

চরণ সরেনের নাম অবশ্য ভুলে যাওয়ারই কথা। গুলি খেয়ে মরে যাওয়া মঙ্গল মার্ডি, শ্যামল হেমব্রমের কথাই বেশিরভাগ সুধীজনেরই মগজে নাই হয়ে গেছে, যেহেতু চলছে গণতন্ত্র জিইয়ে রাখার নির্বাচন-নির্বাচন, সার্চ কমিটির হেড লাইন মিডিয়াতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ট্রাম্পের পুংদন্ডের আকৃতি বিষয়ক টুইট, নারী উদ্যোগে আন্দোলন, ম্যাক্সিকো, পুতিন ইত্যাদি বৈশ্বিক জটিলতায়ও রংপুর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরত আসা চরণ সরেন ভালোই আছেন। সেটাই তার জীবনে প্রথম হাসপাতালের অভিজ্ঞতা।

গত বছরের ৬ নভেম্বর রংপুর চিনি কল কর্পোরেশন এবং পুলিশ এক তরফাভাবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে গুলি ও আগুন চালায়ে গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে থাকা সাঁওতাল- বাঙ্গালিদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। তখন গুলি খাওয়া, না-গুলি খাওয়া, আহত, মৃত বেশিরভাগ সাঁওতালই আসামী হয়ে যান বিভিন্ন মামলায়। চরণ সরেন, ওই দিন পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হয়ে রংপুর হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে হাতে হাতকড়া লাগানোর পর বুঝতে পারেন, তিনি আসামীও।

চরণ সরেনের ডান পায়ের হাঁটু থেকে নিচের দিকে এরকম অসংখ্য ছররা বুলেটের ক্ষত-দাগ। তিনি বলছিলেন, পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে কষ্ট হয় তার।

গত ২৯ জানুয়ারি তিনি মামলা থেকে জামিন পেয়েছেন।

তো, আমরা কথা বলতেছিলাম আসলে গুলির শক্তি বেশি না, তীরের শক্তি বেশি। কিন্তু সে আলাপে ঢোকার আগেই প্রথমবার হাসপাতালে যাওয়া আর প্রথমবার আসামী হওয়ার স্মৃতি আর স্মৃতির ভেতর বিস্ময়, ঘোর, অমিল-বেমিল প্রশ্ন চরণের : “আমি তো চুরিও করি নাই, কিছুই করি নাই, তা ফির হ্যান্ডকাফ লাগাইলো, তায়ও মেডিক্যালো. . . হা হা হা . . .”

 

ইনিই চরণ সরেন, যিনি আমাকে জানান, ভিডিওচিত্রে দেখানো, পা চেঁচিয়ে নিয়ে যাওয়া জ্ঞানহীন, অচেনা সাঁওতাল ব্যক্তির নাম “মাঝি হেমব্রম”।